স্কুল পালানো সেই ছেলেটি

স্কুল পালালেই রবীন্দ্রনাথ হওয়া না গেলেও ক্রিকেটার হওয়া যায়। যার প্রমাণ মোস্তাফিজুর রহমান। ক’দিন আগেও যে ছিল অচেনা-অজানা। সেই অচীন নগরী রূপকথায় থাকলেও বাস্তবে সাতক্ষীরার এই ছেলেটি মহাকাণ্ড ঘটিয়ে নাম লিখিয়েছেন ক্রিক ইনফোর রেকর্ডের পাতায়। যেখানে ক্লিক করলেই পাওয়া যাবে ১৯ বছর বয়সী এই ছেলেটি পরপর দুই ম্যাচে ১১ উইকেট নিয়ে নিজেই একটি নতুন রেকর্ডের খাতা খুলেছেন। তৃতীয় ম্যাচে আরো দুই উইকেট নিয়ে মোট ১৩ উইকেট ঝুলিতে পুরে নাম লিখিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার রায়ান হ্যারিসের সাথে।

career

ছোটবেলা থেকেই স্কুল পালিয়ে ক্রিকেটের পেছনে ছুটতে থাকা মোস্তাফিজুরের স্বপ্নের বাস্তবায়ন হলে, সারথি হন তার পরিবারের সদস্যরাও। তবে পড়ালেখারও যে বড্ড প্রয়োজন। সেটিও হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন বাস্তবের এই হিরো। সাফল্য পেলে যে সবার সামনে কথা বলতে হবে। এটি তো চিন্তায় ছিল না। সময়ের সাথে সাথে সবকিছুকে মানিয়ে নেবে মোস্তাফিজ। এমনটিই বিশ্বাস করেন তার শুভাকাক্সক্ষীরা।
৪৪তম বাংলাদেশী হিসেবে টোয়েন্টি ২০-তে অভিষিক্ত এই বোলার নির্বাচকদের আস্থার প্রতিদান দিয়েছেন। মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টি-২০ তে টসে হেরে ফিল্ডিংয়ে নেমে মাশরাফি বল তুলে দেন ১৯ বছর বয়সী মোস্তাফিজের হাতে। ৪ ওভারে ২০ রান দিয়ে ২ উইকেট শিকার করেন। সেই ম্যাচ শেষে আফ্রিদি প্রশংসা করেন এই তরুণের। আর এবার ভারত সিরিজে প্রশংসার বন্যায় ভাসছেন তিনি। গত বছরের এপ্রিলে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে অভিষেক হয় তার। আর ছয় মাস আগে অভিষেক হয় ঘরোয়া এক দিনের ম্যাচে। ৭টি প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ থেকে তার ঝুলিতে পুরেন ২৩টি উইকেট। তারপর অনূর্ধ্ব-১৯ দল ও ‘এ’ দলের হয়ে দারুণ বোলিং করে নজর কাড়েন। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে খুলনার হয়ে মাত্র আট ম্যাচ খেলে পান ২৩ উইকেট। অনূর্ধ্ব-১৬, ১৮ ও ১৯ সাতক্ষীরা জেলা দলের হয়ে খেলেছেন।

সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রামের কৃষক আবুল কাশেম গাজী ও মাহমুদা খাতুনের ছয় সন্তানের মধ্যে সবার ছোট বরেয়া জিলানী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র মোস্তাফিজুর। সবার বড় সাবেরা পারভীন। এরপর তিন ছেলে মাহফুজার রহমান মিঠু, মো: জাকির হোসেন ও মোখলেসুর রহমান। এরপর মেয়ে সালেহা মাহমুদার পর সবার ছোট মোস্তাফিজুর। কাশেম গাজী ২০০০ সাল পর্যন্ত কৃষিকাজ করতেন। একই সময়ে চিংড়ি চাষও শুরু করেন। ২০০৪ সালে হজ করে আসার পর ব্যবসা-বাণিজ্য ও ঘেরের দায়িত্ব ছেলেদের ওপর দিয়ে তিনি নির্ভার থাকেন।
মোস্তাফিজের খেলার জগতের সার্বক্ষণিক সঙ্গী তার সেজো ভাই মোখলেসুর রহমান। তার কথায়, ছোটবেলা থেকে ও (মোস্তাফিজুর) আমার সাথেই থাকত। সবার ছোট বলে নানা আবদার করত। ভাত খেতে চাইত না। তখন আমি খাইয়ে দিতাম। আমি ক্রিকেট খেলতাম। আমার দেখাদেখি ও ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেট খেলা শুরু করে। বাড়ির উঠানই আমাদের প্র্যাকটিস গ্রাউন্ড। আমাদের দলে বাঁ-হাতি বোলারের প্রয়োজন ছিল। সেই সময় ওয়াসিম আকরাম ও চামিন্দা ভাসও বাঁ-হাতি বোলার ছিল। তাই মোস্তাফিজকেই টার্গেট করি। গ্রামে প্রতিযোগিতামূলক খেলায় বাইরে থেকে হায়ারে খেলোয়াড় আনলে এক হাজার টাকা লাগত। তখন মাথায় এলো বাইরের মানুষকে টাকা দিয়ে কী লাভ। মোস্তাফিজকে ভালো খেলোয়াড় বানাতে পারলে টাকা বেঁচে যাবে। ও ভালো খেলা শুরু করার পর ওকে বিভিন্ন জায়গায় খেলতে নিয়ে যেতাম। বেশির ভাগ দিন স্কুল থেকে গোপনে নিয়ে যেতাম। প্রথম প্রথম ওর স্কুল পালানোর কথা মেজো ভাই ছাড়া পরিবারের অন্য কেউ জানত না। বাবা-মা যখন জানে, তখন সে মোটামুটি ভালো খেলোয়াড়।

স্কুল পালিয়ে ক্রিকেট নিয়ে এই লুকোচুরির সময়ে মেজো ভাইয়ের কারণেই টাকা-পয়সার সমস্যা হয়নি। প্রথম থেকেই সে পড়াশোনা করতে চাইত না। তবে ক্লাস টেনে উঠেছে। ২০১৩ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার কথা ছিল।
মোখলেসুর আরো বলেন, সাতক্ষীরা থেকে আমাদের গ্রাম ৪০ কিলোমিটার দূরে। মিলন নামে একজন খেলোয়াড় আমাদের এখানে আসত। তার সাথে বন্ধুত্ব হয়। সে আমাকে সাতক্ষীরা গণমুখী সংঘের কোচ আলতাফ ভাইয়ের কাছে নিতে বলে। প্রথম দেখার পরই আলতাফ ভাই বলেন, এর পেছনে সময় দাও। ভালো প্লেয়ার হবে। পরে বয়সভিত্তিক খেলার পর মুফাচ্ছিনুল ইসলাম তপু ওকে কোচিং করায়। একপর্যায়ে সালাউদ্দিন স্যারের কাছেও কোচিং করে। সালাউদ্দিন একটি কথা বলেন, সাতক্ষীরার ছেলেরা ১৮ বছর পর্যন্ত ভালো খেলে, তারপর মেয়েদের পিছনে ঘোরে আর হারায়া যায়। আমি ওকে বলেছি, তুই কারো পেছনে ঘুরবি না। সারা দেশ তোর পেছনে ঘুরবে। ও এভাবে চমকে দেবে ভাবিনি। তবে এখন বিশ্বাস হচ্ছে, ও আরো ভালো করবে।
ক্রিকেট কোচ আলতাফ হোসেন বলেন, সৌম্য ও মোস্তাফিজুর দু’জনই আমার ছাত্র। দু’জনই একসাথে জাতীয় দলে খেলছে। একজন বোলার আরেকজন ব্যাটসম্যান। ভিন্ন রকম আনন্দ। মোস্তাফিজুরের বাবা আবুল কাশেম আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার ছেলে যে জাতীয় টিমে খেলছে এটি গর্বের বিষয়। মোস্তাফিজুর আজ আমার একার ছেলে নয়, গোটা জাতির হয়ে ২২ গজের পিচে লড়ছে। তার জন্য সবাই দোয়া করবেন।

সুত্রঃ- অন্য দিগন্ত Jul 27, 2015

[x]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *