সুযোগ তৈরি করে নাও: ইন্দ্রা কে নুই

পেপসিকোর চেয়ারপার্সন ও সিইও ইন্দ্রা কে নুই। তাঁর জন্ম ১৯৫৫ সালে ভারতের চেন্নাইয়ে। তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন মাদ্রাজ ক্রিশ্চিয়ান কলেজ, ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট কলকাতা ও যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটি থেকে। ২০১১ সালের ১৬ মে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েক ফরেস্ট ইউনিভার্সিটিতে তিনি এই বক্তৃতা দেন।

পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার শপথ নিয়ে আজ তোমাদের পথচলা শুরু হবে।

438_sujog

তোমাদের এমন সব সুযোগ ও সম্ভাবনা আছে, যা আজ অবধি কোনো প্রজন্মেরই ছিল না। সামাজিক নেটওয়ার্কিং, তাৎক্ষণিক যোগাযোগ ও ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতির ফলে অর্থনৈতিক আর সামাজিক সমস্যার সমাধান এখন সাধারণ মানুষের কাছ থেকেই উঠে আসছে, যা এর আগে সম্ভব ছিল না। তোমাদের সামনে সমস্যাগুলো পুরোনো হলেও পুরোনো ধাঁচের সমাধানের মধ্যে তোমাদের সীমাবদ্ধ থাকার কোনো কারণ নেই। এ প্রজন্ম পুরোনোকে ভেঙে নতুন পথ তৈরি করবে।
এই যাত্রার শুরুতে আজ আমি তোমাদের কিছু পরামর্শ দিতে চাই, যা তোমাদের পথ চলতে সাহায্য করবে। প্রথমেই আমি বলব, সব সময় শিখতে থাকো, এক মুহূর্তের জন্যও থেমো না। তোমাদের ভেতরে যে কৌতূহলী সত্তাটি লুকিয়ে আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে গিয়ে তাকে হারিয়ে ফেলো না। শৈশবের সবচেয়ে অসাধারণ দিকগুলোর একটি হচ্ছে পৃথিবীকে জানার, বোঝার তীব্র ইচ্ছা, যা বেশির ভাগ মানুষই বড় হতে হতে হারিয়ে ফেলে। ‘কেন?’ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার উৎসাহ ফুরিয়ে যায়। হ্যাঁ, আজকে তোমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হচ্ছে, কিন্তু সত্যিকারের শিক্ষার কোনো শেষ নেই, পূর্ণতা নেই। বাইরের পৃথিবী থেকে তোমরা যা শিখবে, তা এক অনন্ত বিস্ময়ের উৎস হয়ে তোমাদের জীবন ভরে তুলতে পারে, যদি তোমরা তাকে গ্রহণ কর।
১৯৮৬ সালে আমি বস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ থেকে মটোরোলার অটোমোটিভ ইলেকট্রনিকস ডিভিশনের হেড অব স্ট্র্যাটেজি পদে যোগদান করি। তখন কোম্পানির উঁচু পর্যায়ের হাতে গোনা নারীদের মধ্যে আমি ছিলাম একজন। প্রথম মিটিংয়ে এসে আমি হতভম্ব; উপস্থিত সবার মুখে ইলেকট্রনিকস আর গাড়ি ছাড়া কোনো কথা নেই—আর এ দুটির কোনোটি নিয়েই আমার ধারণা প্রায় ছিল না বললেই চলে। আমি কিছু গৎবাঁধা প্রশ্ন করে, কতগুলো মডেল বানিয়েই হয়তো পার পেয়ে যেতে পারতাম, কিন্তু আমি আরও বেশি কিছু করতে চেয়েছিলাম। আমি কোম্পানিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে চাইছিলাম, এর ভবিষ্যৎ সুদৃঢ় করতে চাইছিলাম।
নতুন জিনিস শেখার ইচ্ছেটাকে ধরে রাখো, আর তোমার কাজের বিষয়ের গভীরে ডুব দেওয়ার আগে চারপাশটাও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে নিয়ো। ব্যবসার জগৎ নিয়ে আমার সবচেয়ে সেরা উপলব্ধিগুলোর মধ্যে বেশ কিছু এসেছে অন্যান্য বিষয়ে পড়তে পড়তে, কিংবা সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কোনো কিছুকে বিচার করতে গিয়ে। ব্যবসার ক্ষেত্রে আমাকে যেসব জ্ঞান এগিয়ে দিয়েছে, তার মধ্যে অনেক কিছু এসেছে ইতিহাস, মনোবিজ্ঞান, এমনকি রসায়নের মতো বিষয় থেকে। যেসব জিনিস আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় সম্পর্কহীন, বিচ্ছিন্ন, তাদের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করতে পারার ক্ষমতা আমাকে অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছে।
আজকের পৃথিবীতে পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা থাকা খুব প্রয়োজন। তোমরা আজ যা জানো, কালই তা সেকেলে হয়ে পড়বে। কেবল একটি জিনিস শিখে টিকে থাকা এখন মুশকিল। আর এর অর্থ একটাই, প্রতিনিয়ত শিখতে হবে।
তোমাদের জন্য আমার দ্বিতীয় পরামর্শ হলো সবকিছুকে সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে—তা ব্যর্থতা, কোনো একঘেয়ে কাজ, ক্যারিয়ারে হঠাৎ কোনো পরিবর্তন, যা-ই হোক না কেন। প্রতিটি অভিজ্ঞতাই নতুন কিছু শেখার এবং নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলার এক দারুণ সুযোগ। আর শুধু সুযোগগুলোকে চিনতে শিখলেই হবে না, নিজের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে সেগুলোর সদ্ব্যবহার করতে হবে। অনেক আগে থেকে ক্যারিয়ারের আগাগোড়া পরিকল্পনা করে রাখা সম্ভব নয়, তা উচিতও নয়। কোনো নির্দিষ্ট চাকরিই করতে হবে, এমন বদ্ধমূল ধারণা মনে গেঁথে চোখ-কান বুজে সেই চাকরির দিকে ছুটে চললে পথের আশপাশে ছড়িয়ে থাকা হাজারো সুযোগ চোখ এড়িয়ে যায়, যা করাটা বোকামি।
৯০-এর দশকের শেষের কথা, তখন আমি পেপসিকোর করপোরেট স্ট্র্যাটেজি ও ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান। স্টিভ রেইনমান্ড, আমার সাবেক বস, একদিন সোজা আমার অফিসে এসে বললেন, ‘আমি চাই তুমি ফ্রিটো-লেতে যাও এবং আমাদের পণ্য সরবরাহের পদ্ধতি বদলে ফেলার প্রকল্পের নেতৃত্ব দাও।’ আমার সামনে দুটি পথ ছিল—কঠিন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করা অথবা যেখানে ছিলাম সেখানেই থেকে যাওয়া। আমি চ্যালেঞ্জকে বেছে নিয়েছিলাম এবং আমার আজকের অবস্থানের পেছনে সেই সাহসী সিদ্ধান্তের অবদান অপরিসীম।
তবে শুধু চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেই হবে না, নিজের সর্বোচ্চ সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে সবচেয়ে ভালো কাজ করতে হবে। হোক সেটা প্রথম চাকরি বা নিজের ব্যবসা, বা একটা ফটোকপি মেশিন চালানো—যে কাজই করো না কেন, সেখানে নিজের ১১০ ভাগ সামর্থ্য উজাড় করে দেবে। বহুদিন আগে ঠিক করে রাখা ক্যারিয়ারের পেছনে ছুটতে গিয়ে আরও সম্ভাবনাময় কোনো দরজা ভুলে বন্ধ করে ফেলো না।
আমার তৃতীয় পরামর্শ হলো, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে হবে। কাজ করতে গিয়ে ভিন্ন মতের, ভিন্ন সংস্কৃতির, ভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে দেখা হবে, তাদের সঙ্গে মিশতে হবে। সে ক্ষেত্রে অন্যদের সঙ্গে অমিলগুলো না খুঁজে, সবার ভালো দিকগুলোকে প্রাধান্য দিতে হবে। তুমি যখন অন্যদের ভালো ব্যাপারগুলোকে প্রাধান্য দেবে, বিনিময়ে তারাও তোমাকে ভালো চোখে দেখবে। এটা ঠিক যে কর্মক্ষেত্রে সমালোচনা থাকবেই, সেটি অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। তোমার যদি নিজের ওপর দৃঢ়বিশ্বাস ও আস্থা থাকে, তবে সমালোচনা, সমস্যা, ব্যর্থতা—যা-ই আসুক না কেন, সেখান থেকেই তুমি নতুন কিছু শিখতে পারবে এবং পরেরবার ঠিকই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। আর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে এমনভাবে কাছে টানে যে সুসময় বা দুঃসময়, যা-ই আসুক না কেন, তুমি কখনো একা হবে না।
নিজের ভেতরে সুপ্ত কৌতূহলকে জাগিয়ে রেখো আর সব সময় শিখতে থেকো, কখনো থেমে যেয়ো না। নিজের সবটুকু উজাড় করে কাজ করো, সুযোগ তৈরি করে নাও। সবকিছুকে ইতিবাচকভাবে নিতে শেখো। তুমি পৃথিবীকে যা দেবে, তা-ই তুমি ফিরে পাবে। আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি, তোমরাই এ পৃথিবী বদলে দেবে।
সূত্র: ওয়েবসাইট। ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ: অঞ্জলি সরকার

[x]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *