শিক্ষক নিয়োগে গণবিজ্ঞপ্তি নিয়ে কিছু কথা

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের জন্য সম্প্রতি প্রকাশিত গণবিজ্ঞপ্তি নিয়ে কিছু কথা বলার জন্য আজকের এই লেখা। শুরুতেই এনটিআরসিএ কর্তৃক রেজিস্ট্রেশনকৃত বেসরকারি স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা শনিবার (২৫জুন) পর্যন্ত ই-রিকুইজিশন ফরম পূরণ করে শিক্ষক নিয়োগের চাহিদাপত্র দেয়ার প্রসঙ্গ। এতে কৃষি শিক্ষা বিষয়টিতে প্রভাষক পদের তালিকায় অন্তভূর্ক্ত করা হয়নি।

উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে অধিকাংশ কলেজে কৃষি শিক্ষা বিষয়টি শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয়।কৃষি শিক্ষা ছাড়াও সাচিবিক বিদ্যা বিষয়টিও তালিকায় নেই। কয়েকটি বিষয়ের ভুল নাম লেখা হয়েছে। বিষয় তালিকায় আছে-কম্পিউটার সাইন্স। প্রকৃতপক্ষে এ বিষয়টির নাম হবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি। যাকে সংক্ষেপে আইসিটি বলা হয়ে থাকে। আইসিটি ৬ষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত আবশ্যিক বিষয় হিসাবে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভূক্ত। এমপিওভূক্ত উচ্চবিদ্যালয় সংযুক্ত প্রাথমিক শাখার সহকারী শিক্ষকদের পদগুলো ই-রিকুইজিশন ফরমে যুক্ত করা হয়নি।

আলিম, ফাজিল ও কামিল মাদ্রাসার প্রভাষক পদের বিষয় তালিকায় বাংলা, ইংরেজি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইসলামের ইতিহাস, পদার্থ , রসায়ন, জীববিজ্ঞান, গণিত, আইসিটি বিষয়গুলো যুক্ত করা হয়নি। দাখিল মাদ্রাসায় ইবতেদায়ি প্রধান, জুনিয়র শিক্ষক, জুনিয়র মৌলভি, ক্বারী শিক্ষকদের পদগুলো উল্লেখ নেই।

মাধ্যমিক স্তরের পদ/বিষয় তালিকায় সহকারী শিক্ষক (ধর্ম) উল্লেখ আছে।কিন্তু ইসলাম/হিন্দু/ খ্রিষ্ট/বৌদ্ধ ধর্মের অপশন উল্লেখ না থাকায় কোন ধর্মের শিক্ষক প্রয়োজন তা বাছাই করা যাচ্ছে না।। ২৫ জুনের আগেই এ বিষয়ের তালিকা সংশোধন করা জরুরি।

ই-রিকুইজিশন ফরম পুরণ করার পর টেলিটকে এসএমএস করে ফি/টাকা পাঠাতে বলা হয়েছে।কিন্তু টাকার পরিমাণ কত তা উল্লেখ করা হয়নি।রিকুইজিশন আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে মর্মে সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকের নিকট ক্ষুদে বার্তা আসবে বলা হয়েছে।কিন্তু সব প্রতিষ্ঠানে তো আর প্রধান শিক্ষক নেই।প্রধান শিক্ষকের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান প্রধান/সুপার ও অধ্যক্ষ পদবি উল্লেখ করা যেত। ই-রিকুইজিশন ফরম পুরণের পূর্বে প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক কাজ শেষ করতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক কাজ বলতে ঠিক কী কী কাজকে বুঝানো হয়েছে তা উল্লেখ করা প্রয়োজন।বোধ করি।
২৫ জুনের মধ্যে বেসরকারি স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার প্রধানগণ ই-রিকইজিশন ফরম পূরণ করে ৩০ জুন পর্যন্ত শূন্য হওয়া পদগুলো পূরণের জন্য শিক্ষক নিয়োগের জন্য এনটিআরসিএ এর নিকট আবেদন করবে। এনটিআরসিএ ৩০ জুন শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করবে। নিবন্ধন সনদধারীরা ২৮ জুলাই এর মধ্যে অনলাইনে এনটিআরসি বরাবর আবেদন করবে।

নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ নিবন্ধন সনদের ঐচ্ছিক বিষয়ের নম্বরের ভিত্তিতে মেধা ও আঞ্চলিক অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রার্থীর নিজ উপজেলার বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একটি শূন্য পদের বিপরীতে একজন মাত্র প্রার্থীকে মনোনীত করে সভাপতি ও প্রতিষ্ঠান প্রধান কে ক্ষুদে বার্তা এবং চিঠি পাঠাবেন। প্রার্থী বাছাইকালে উপজেলার প্রার্থীদেরকে সর্বপ্রথম অগ্রাথিকার দেয়া হবে।

চিঠি/বার্তা পেয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ ১ মাসের মধ্যে এনটিআরসিএ কর্তৃক মনোনীত প্রার্থীকে নিয়োগপত্র প্রদান করবে।উপজেলায় অবস্থিত কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য ঐ উপজেলার কোন যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ের প্রার্থীকে মনোনীত করা হবে।বিভাগীয় শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ঐ বিভাগের প্রার্থীদের বাছাই করা হবে।

রাজধানী ঢাকার (উত্তর ও দক্ষিণ সিটির) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পদসমুহ সারা দেশের প্রার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কেবল চাকরিতে প্রবেশ পর্যায় (entry level) অর্থাৎ সহকারি শিক্ষক, প্রদর্শক ও প্রভাষক নিয়োগ দেয়া হবে।যেসব পদে অভিজ্ঞতা প্রয়োজন হয় অর্থাৎ সহকারি প্রধান শিক্ষক/সহসুপার, প্রধান শিক্ষক/সুপার, অধ্যক্ষ এবং কর্মচারি পূর্বের নিয়মে কমিটি কর্তৃক নিয়োগ প্রাপ্ত হবেন।

আশা করা যায় অদূর ভবিষ্যতে এনটিআরসিএ বাকি পদগুলোতে নিয়োগ প্রদানের ক্ষমতা তাদের হাতে গ্রহণ করবে। একই ধরনের প্রতিষ্ঠানে দুই রকম নিয়োগ পদ্ধতি প্রযোজ্য হতে পারে না। শিক্ষামন্ত্রণালয়ের নতুন নিয়োগ পদ্ধতি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যুগান্তকারী এক কল্যাণকর নব অধ্যায়ের শুভ সূচনা করবে।

নিবন্ধনধারীদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন:

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বাণিজ্য ঠেকাতে শিক্ষামন্ত্রণালয় নিয়োগ বিধি সংশোধন করে নিয়োগের ক্ষেত্রে পরিচলনা কমিটির ক্ষমতা খর্ব করে নতুন নিয়োগ বিধি জারি করে।এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায় শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি মহামারী আকার ধারন করার প্রেক্ষাপটে এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

মেধাহীন অযোগ্যদের ভীড়ে বেসরকারি স্কুল কলেজ মাদ্রাসা ডুবতে বসেছে।বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী এনটিআরসিএ নিবন্ধনধারীদের মধ্য থেকে নিয়োগ দিবে।প্রশ্ন উঠেছে নিবন্ধন সনদধারীদের যোগ্যতা নিয়ে। বেসরকারি স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগে কোন বয়স সীমা নেই।৫৯ বছর বয়সেও যে কারো নিয়োগ পেতে বাধা নেই।অনেকে নিবন্ধন সনদ অর্জন করেছেন পেছনের দরজা দিয়ে।

টাকার বিনিময়ে সনদ কিনতে পাওয়া গেছে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে কেউ কেউ নিবন্ধন পরীক্ষা না দিয়েও সনদ লাভ করেছেন। এটা অনিস্বীকার্য যে, নিবন্ধন সনদধারীদের মধ্যে অনেক মেধাবী ও যোগ্য প্রার্থী আছেন।তবে যারা ভিন্ন পথে সনদ লাভ করেছেন তারা কোন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পেলে শিক্ষার্থীদের কী হবে। ভেবে দেখুন।
একটি বাস্তব উদাহরণ:

মধ্যম মানের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে একজন নিবন্ধন সনদধারী ইংরেজিতে অনার্সসহ এমএ ডিগ্রিধারী যুবককে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি ৯ম শ্রেণিতে মোবাইল ফোনের ওপর একটি প্যারাগ্রাফ পড়াতে গিয়ে ইংরেজির যে বাংলা অর্থ বলেন শিক্ষার্থীরা তা লিখে রাখে। তিনি দশটি শব্দের ৯টিরই ভুল অর্থ বলেন। তাঁকে বরখাস্ত না করে তার যোগ্যতা প্রমানের সুযোগ দেয়া হয়। এক বছর পর তার মানের উন্নতির কোন লক্ষণ না দেখে অবশেষে তাকে বিদায় দেয়া হয়।

এর মধ্যে তিনি পার্শ্ববর্তি একটি মাদ্রাসায় ইংরেজি বিষয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চাকরির জন্য যোগাযোগ করেন। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তাকে নিয়োগ দিতে রাজি হন। ইন্টারভিউ বোর্ডে তিনি আরো দুইজন ডামি প্রার্থী হাজির করেন ইন্টাভিউ বোর্ড বৈধ করতে। কিন্ত বিধি বাম!লিখিত পরীক্ষায় আসল প্রার্থী নকল প্রার্থীদের চেয়ে কম নম্বর পান। আসল প্রার্থী ৩ জনের মধ্যে তৃতীয় হন।মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তাঁকে নিয়োগ দিতে রাজি থাকলেও সরকারি প্রতিনিধি এমন দুর্বল প্রার্থীর পক্ষে সায় না দেয়ায় তাঁর চাকরি হয়নি।

দেশের শতশত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কমিটি নিয়ে ঝামেলা/মামলা মোকদ্দমা আছে।কখন কখন কমিটির অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়। অনেক প্রতিষ্ঠান চলছে কমিটি ছাড়াই। এসব ক্ষেত্রে উপজেলা নির্বাহি অফিসার/জেলা প্রশাসক বিশেষ ব্যবস্থায় বেতন বিলে স্বাক্ষর করে থাকেন।তাঁরা এসব প্রতিষ্ঠানের সভাপতি নন। অথচ রেজিষ্ট্রেশন করার সময় ইউএনও/ডিসিকে সভাপতি হিসাবে দেখানো হয়েছে। যখন এনটিআরসিএ একজন শিক্ষককে মনোনীত করে কোন কমিটি বিহীন প্রতিষ্ঠানে পাঠাবেন । তখন কি হবে।কমিটি বিহীন প্রতিষ্ঠান তো তাঁকে নিয়োগ দিতে পারবে না।

কর্তৃপক্ষের বিকল্প ভাবনা থাকতে হবে। কোন কারণে কমিটি কোন মনোনীত শিক্ষককে/প্রার্থীকে নিয়োগ না দিলে বা না দিতে পারলে সে ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এসব বিষয়গুলো এনটিআরসিএ কর্তৃপক্ষের নজরে আসতে হবে মনে করি। নিয়োগের ক্ষেত্রে কমিটির ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে।বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগে সরকারের প্রশংসনীয় উদ্যোগ যেন কোনভাবেই ব্যর্থ না হয় সে দিকে কর্তৃপক্ষকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

[x]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *