জাতীয়করণের জন্য শিক্ষকের মৃত্যু, আমাদের চোখ খুলে দেবে কী?

স্বল্প খরচে মানসম্মত শিক্ষা, দেশের প্রান্তিক জনগণের নিকট সরকারি সেবা পৌছে দেওয়া, শিক্ষার্থী ঝরেপড়া রোধ এবং বাল্যবিবাহ রোধে সরকার প্রতিটি দেশের প্রতিটি উপজেলাতে একটি করে স্কুল ও একটি করে কলেজকে জাতীয়করণ করার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হাতে নিয়েছিলো। কিন্তু সরকারের নেওয়া মহতী এ উদ্যোগ শেষ পর্ষন্ত রাজনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে পর্যবসিত হচ্ছে! তা নাহলে কোনরকম নীতিমালা না মেনে কেন যেসব কলেজের বয়স ২-১ বছর।

যেগুলোর শিক্ষার্থী সংখ্যা ২০-৫০ জন, যে কলেজে পাসের হার ৫ শতাংশ, অথবা পাসের হার একেবারে শূন্য সেসব কলেজকে কোন নীতিমালা কিংবা কি কারণে জাতীয়করণের জন্য মনোয়ন দেওয়া হলো?
সরকার চারটি শর্ত রেখে নীতিমালা প্রণয়ন করার কি দরকার ছিলো যদি সেই নীতিমালার কোন প্রতিপলন না ঘটিয়ে কেবল এমপি, মন্ত্রীদের সুপারিশ আর আমলাদের ঘুষের বিনিময়ে জাতীয়করণের জন্য প্রতিষ্ঠান মনোয়ন পায়? কেনই বা সরকারের দেওয়া জাতীয়করণের জন্য প্রতিটি শর্ত থাকার পর অনুপযুক্ত প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে? এমনও দেখা গেছে যে, বিভিন্ন স্থানের মন্ত্রী, এমপি, শিক্ষা কর্মকর্তা প্রভৃতির দুর্নীতি কিংবা অসচেতনতার কারণে অনেক যোগ্য ও মানসম্মত কলেজকেও জাতীয়করণের আওতায় নিয়ে আসা হয়নি পরিশেষে এসব প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্টরা প্রতিদিনই তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করছে বিভিন্ন ধরনের বিক্ষোভ, মানববন্ধন, স্বারকলিপি প্রদান কিংবা হরতালের মতো কর্মসূচি দিয়ে।

আর এসব কর্মসূচি পালন করে কিছু কিছু কলেজ সফলও হয়েছে অর্থ্যাৎ ঐ সব কলেজের নাম জাতীয়করণের তালিকায় অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে আবার কোন কোন অযোগ্য কলেজর নাম জাতীয়করণের তালিকায় থাকলেও পরবতীর্তে বিভিন্ন কর্মসূচি, কিংবা সংবাদ মাধ্যমে ঐ সব কলেজের অযোগ্যতা আর টাকা লেনদেনের মাধ্যমে যোগ্য করানোর চেষ্টা বেরিয়ে আসলে তাদের বাদ দেওয়া হয় এবং অন্য যোগ্য কলেজকে জাতীয়করণের আশ্বাস দেওয়া হয় যেমন- তালিকায় নোয়াখালীর চরজব্বার কলেজকে বাদ তার তাতে সৈকত কলেজকে অর্ন্তভুক্ত করানো আবার চট্রগ্রামের হাটহাজারী কলেজকে অর্ন্তভুক্ত করে নাজিরহাট কলেজকেও একই উপজেলা থেকে জাতীয়করণের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে! কিন্তু অযোগ্য কলেজকে মনোনয়ন দেওয়ায় কোন শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এরকম একটি যোগ্য কলেজের নাম ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া ডিগ্রি কলেজ যার আয়তন, প্রতিষ্ঠাকাল, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, ফলাফল সব শর্তই পূরণ করেও কেবল বঙ্গমাতার নামে নাম থাকায় শেখ ফজিলাতুন্নেছা কলেজকে জাতীয়করণের আওতায় নিয়ে এসে ফুলবাড়িয়া ডিগ্রি কলেজকে তালিকাভুক্ত থেকে বাদ দেয়া হয় আর তখনি ক্ষোভে ফেটে পড়ে ফুলবাড়িয়া উপজেলার ঔ কলেজের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলে । দীর্ঘ ৪৩ দিন নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে পুলিশের গুলি কিংবা বেদড়ক লাঠিপেটায় শিক্ষক ও ভ্যানচালকের মৃত্যুর মধ্যদিয়ে! স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে এ কোন সমাজে আমরা বাস করছি যেখানে শিক্ষক কিংবা এর সাথে সংশ্লিষ্টরা তাদের আঙ্গিনায় আন্দোলন করতে পারবেনা? বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, স্যোশাল মিডিয়া এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় স্পষ্টই দেখা গিয়েছে যে পুলিশ কলেজ ক্যাম্পাসের ভিতরে প্রবেশ করে ছাত্র-শিক্ষক এমনকি ছাত্রীদের বেদড়ক পিঠাতে, যদিও পরে ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার রাতে বেসরকারি এক টিভি চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পুলিশকে নির্দোষ আখ্য দিয়ে শিক্ষকের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে বলে দাবী করে কিন্তু একপযায়ে সেই পুলিশ সুপার নিজের অজান্তেই নিজের বাহিনীর দোষ স্বীকার করেন ।

কিন্তু প্রশ্ন হলো শিক্ষক ও ভ্যান চালক হত্যাকারী অতি-উৎসাহী পুলিশ সদস্যের বিচার হবে কি? প্রশ্ন জাগে পুলিশ কিভাবে একজন শিক্ষকের গায়ে তার কর্মস্থলে এসে লাঠির আঘাত দিতে পারে? কে দিবে এই উত্তর? শিক্ষামন্ত্রী! আপনি তো বলেছিলেন শিক্ষকদের বেতন দিয়ে মূল্যায়ন করা যায়না তার মানে তাকে মূল্যায়ন করতে হয় সন্মান দিয়ে কিন্ত আপনি পুলিশের লাঠিপেঠায় শিক্ষকের মৃত্যুকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? কেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সুরক্ষা আইন তৈরি হলেও শিক্ষকদের সেখানে আওতাভুক্ত করা হলোনা? শিক্ষকরা কি এতই অনৈতিক? কেন জাতীয়করণ নিয়ে এই অসন্তোষ? কারা এই অসন্তোষ তৈরী করলো তাদের কি বিচার হবে? নাকি বহাল তবিয়তে থেকে এই ধরনের ঘটনা পুনরায় ঘটানোর ফন্দি আঁকবে? শিক্ষককে লাঠিপেঠা করতে হবে কেন? কেনইবা শিক্ষকদের জন্য রাবার বুলেট ব্যবহার করতে হবে? তারা তাদের দাবি আদায়ে নিজের কর্মস্থলে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করতে পারবেনা? তারা কি রাস্তায় নেমে গাড়ী ভাংচুর করছিলো নাকি জনজীবনের স্বাভাবিকতাকে বাধা দিচ্ছিলো? আর কত শিক্ষকের প্রাণ গেলে উপর্যুক্ত বেতন না দিয়ে সম্মানের বুলি শুনাবেন শিক্ষামন্ত্রী?

আর কত শিক্ষক লাঞ্চিত হলে এই সম্প্রদায়ের জন্য সুরক্ষা আইন তৈরী করবেন? আর কত পুলিশের বুটের লাথি আর বন্দুকের নলের আঘাত কিংবা বুলেট খেলে সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থাকে জাতীয়করণের আওতায় নিয়ে আসবেন? কবে জাতীয়করণের নামে এই কলহ বন্ধ হবে? জানতে ইচ্ছে মহিলা কলেজকে জাতীয়করণে অগ্রাধিকার কেন? মহিলা কলেজকে জাতীয়করণের আওতায় নিয়ে আসলে কত শতাংশ শিক্ষার্থী উপকৃত হবে? কেন মন্ত্রী এমপিদের ডিও লেটারকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে? নীতিমালা থাকলে আবার ডিওর বিষয়টি আসবে কেন? এর দ্বারা কি বিষয়টিকে রাজনৈতিক বলে প্রমাণিত হয়না? তবে সবচাইতে দুঃখের বিষয় হচ্ছে কেউ কেউ ফুলবাড়ীয়ার ঘটনাকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের হাতিয়ার মনে করে শিক্ষক কিংবা ভ্যান চালকের মৃত্যুকে মূল্যহীন করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

এই কোন সমাজ যেখানে শিক্ষকের মৃত্যুর পরও আমরা রাজনৈতিক ফায়দা লুটাতে পথ খুজি? একজন শিক্ষকের করুন মৃত্যুর পরও কোন শিক্ষক সমিতির পক্ষথেকে কোন একটা বিবৃতি দেওয়ার সাহস দেখায়নি সেই সব শিক্ষক সমিতিসমূহের কি জানাযা পড়ে নিহত শিক্ষকের সাথে দাফন করাই শ্রেয়। আমাদের মনে রাখা দরকার পৃথিবীতে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ একেবারে নিঃশর্তভাবে সন্তানের কল্যাণ চায় এক হলো মাতাপিতা আর অন্যটি হলো এই শিক্ষক সমাজ। অথচ এই তাদের নিয়ে আজ প্রশ্ন তোলা হচ্ছে! বলতে দ্বিধা নেই যে ফুলবাড়ীয়া ডিগ্রি কলেজের মত দেশের সকল মাধ্যমিক ও কলেজ শিক্ষকদের মনে জাতীয়করণ নিয়ে এই ধরনের ক্ষোভ বিদ্যমান যার বহিপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে গত কয়েকদিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষকদের মানববন্ধনের মধ্যদিয়ে। যাই হোক, শিক্ষামন্ত্রী সহ সংশ্লিষ্ট সকলের নিকট সমগ্র শিক্ষক সম্প্রদায়ের দাবি ফুলবাড়ীয়া ডিগ্রি কলেজের ঘটনার দ্রুত ও সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করে এই ধরনের অনাকাঙ্খিত ঘটনা যাতে পরবর্তীতে না ঘটে তার জন্য ২৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মত ফুলবাড়ীয়া ডিগ্রি কলেজসহ সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থাকে জাতীয়করণের আওতায় নিয়ে আসার ত্বরিৎ ঘোষণা দেওয়া। পাশাপাশি আত্তীকরণ বিধিমালা ২০০০ সংশোধন করে শিক্ষক সুরক্ষা আইন প্রণয়ের দ্রুত কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া।

লেখক: মো. শরীফুর রহমান আদিল, প্রভাষক, দর্শন বিভাগ, ফেনী সাউথ ইস্ট ডিগ্রি কলেজ।

[মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়]

[x]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *